আমি :আচ্ছা আপু,রাহাতকে চিনেন? আমার বন্ধু।ইন্টারেই পড়ে।এখানকার কোনো কলেজে হয়তো!
তরুণী : হ চিনি!
আমি : আপনি কি আমাকে তার ঠিকানাটা দিতে পারবেন? প্লিজ প্লিজ..
তরুণী: হ দিতে পারুম।তোরে রাহাত না খালি,এই দুনিয়ার বেবাক রাহাতের খবরই আমি দিতে পারমু!চল আমার লগে!
এই কথা বলেই মেয়েটি আমার শার্টের কলারে ধরে জোরপূর্বক ভিতরে নিয়ে গেলো।
আমি : আহ্ আ! কি করছেন আপনি? ছাড়ুন প্লিজ,ছাড়ুন! কি করছেন আপনি...
তরুণী: না না সোঁয়াচান পাখি, তোমারে আইজকা আমি ছাড়ুম না! তুমি আইজকা আমার দিনের বেলার পাখি! অনেক কষ্টে তোমারে শিকার করছি!
এই কথা বলে মেয়েটি একটি কক্ষে নিয়ে গেলো আমায় এবং তার খাটে নিয়ে বসালো! তারপর-
তরুণী: কি রে চান্দু,ভাব মারাও আমার লগে? তুমি আর বুঝো না, নাহ্? আইছো রস খাইতে, আর বুঝাইতাছো- দুইন্ন্যার কোনো হাল-ই তুমি বুঝো না, নাহ্?
আমি : সত্যিই আমি কিছুই বুঝতে পারছি না! আপনি এসব কি বলছেন আবোল- তাবোল! আমি এসেছি রাহাতের খোঁজে! আর আপনি আমাকে এখানে টেনে নিয়ে এলেন কেন?
(তখন পর্যন্ত আমি বুঝে উঠতে পারি নি উনি একজন পতিতা; খাস বাংলায় যাকে বলে - 'দেহব্যবসায়ী'!) তারপর-
তরুণী: তা বুঝবা কেন? তুমি রাহাতের সন্ধানে এই পট্টিট আইবা,এইডা পাগলেও বিশ্বাস করবো না! তুমি তো আইছো ঝুমুরের কাছে, ঝুমুর নৃত্য দেখবার লাইগ্যা!
এই কথা বলেই মেয়েটি অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো!
তারপর -
আমি : দেখুন সত্যিই আপনি ভুল বুঝছেন আমাকে।আমি অমন ছেলেই নই!
মেয়েটি তখন তার পায়ে থাকা ঝুমুরের শব্দ তুলে বললো-
এবার বলুন আপনি কেমন ছেলে?
এই কথা বলেই মেয়েটি আবার সশব্দে হেসে দিলো!
আমার আর বুঝতে বাকী রইলো না - আমি একজন পতিতার খপ্পরে পড়েছি!
আমি : আচ্ছা আপনি এই পেশায় কতদিন? কিভাবে আসছেন? একটু বলবেন? আমার না জানার খুউব ইচ্ছে,বলবেন?
তরুণী তখন মৃদু হেসে বললো-
ক্যান, আমারে নিয়া ফিলিম বানাবা চান্দু!
আমি : না, তা না! তবে আমি একটা ডকুমেন্টারি বানাবো ভাবছি।আপনাদের নিয়ে!
তরুণী: এসব ডকুমেন্টারি ফকুমেন্টারির আলাপ বাদ দেইন।যে কাম করবার আইছুইন,ঐডা কইর্যা টেহা দিয়ে চইল্যা যাইন!
এই কথা বলেই যখন আমার শার্টের বোতাম ধরে টান দিয়েছে, অমনি আমি তার গালে সজোরে চপেটাঘাট করে বসি! আর বলি-
আমাকে কি তোমার এখনও এমন ছেলে মনে হয়! আমি আগেই বলেছি তো, আমি ভুলক্রমে এখানে চলে এসেছি।তারপর যখন এসেই পড়েছি,তখন তোমার গল্পটা শুনে যাই....
এবার দেখলাম মেয়েটির চোখে অশ্রু! এই অশ্রুর মানে কী তা আমার বোধগম্য হতে সময় লাগলো না!
তরুণী : সত্যিই আপনি আমার কাহিনি শুনবেন?
আমি : (আগ্রহের স্বরে) হুম বলো..
মেয়েটি বলা শুরু করলো -
" এককালে আমারও একটা ঘর আছিল,আমার ও একটা পরিবার আছিল! আমিও ছিলাম কারো মেয়ে,কারো বোন! আমগর পরিবার ঠিকমতোই চলতাছিল! এমন সময় -
আমি : এমন সময় কী?
তরুণী: এমন সময় আমার আব্বার কাছে এক লোক (এলাকার চাচা) আইয়্যা কইলো - তোমার দরিদ্রের সংসার! তোমার মাইয়াডারে কামে লাগাও না ক্যান? তখন আব্বা কইলো - কই কামে লাগামু ওরে! গেরামে তো কোনো কাম নাই! আর যেই বেতন দেয় এইনে,তাতে কি আর আমগর সংসার চলবো?
তখন চাচা কইলো - তোমার মাইয়ারে আমি শহরে নিয়া চাকুরি দিমু! অনেক বেতন পাইবো! তোমগর সংসার ম্যালা ভালা চলবো!
এই কথা শুইন্যা আব্বা আমারে চাচার লগে শহরে পাঁঠাইতে রাজি হয়! চাচা ৭০ হাজার টেহার বিনিময়ে এক দালালের কাছে আমারে বিক্রি কইরা দেয়! তারপরের কাহিনিটা সবারই জানা! এরপর থেইক্যাই আমি 'ঝুমুর', এই পাড়ার ঝুমুর!
এই কাহিনি শুনে আমার চোখ দিয়ে টলটল করে পানি চলে আসলো! আমি বললাম -
"তোমার কি এই জগত ছেড়ে দিতে মন চায় না? "
"চায় তো! কিন্তু কেডা নিবো আমারে!আপনি? " এই কথা বলে ঝুমুর সশব্দে হেসে দিলো।
আমি : তা না!তবে...
ঝুমুর : "কোনো তবে না! এই জগতে যে একবার আইছে,তার আর ফিরার রাস্তা খোলা নাই! আর না খাইয়া মরার চাইতে খাইয়া বাঁইচ্যা থাকাটা কি ভালা না? আর এই লাইন ধরেন ছাইড়াই দিলাম, আমারে খাওয়াবো কেডা,পিন্দাবো কেডা? এই সমাজ,রাষ্ট্র,বিশ্ব?
এই সমাজ তো আমগোরে মানুষ-ই মনে করে না।এই রাষ্ট্র কি জানে আমরা কিরম আছি,কোথায় আছি? এই বিশ্ব কি জানে? আমরা বিশ্বেই বাঁচি!"
এই কথা বলেই হাহা করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে ঝুমুর।আর তার পায়ে বেজে উঠে ঝুমুরের সেই চিরতরুণ সুর - ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং!