ছোটগল্প : আই হ্যাভ অ্যা স্টোরি
3 years ago By Rayhan Riyad Mollick 

তখন সবেমাত্র ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ করেছি। ২০১৪ সাল! সামনে 'ভার্সিটি অ্যাডমিশন টেস্ট' নামক এক ভয়ানক রাক্ষস দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।সেই সুবাদে ময়মনসিংহ শহরে আসা।মূল উদ্দেশ্য -কোচিং করে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নাম লিখানো যায় কিনা তার চেষ্টা। যেই চিন্তা,সেই কাজ! বাসা রেখে দিলাম।নওমহল! ত্রিশাল বাসট্যান্ড থেকে কিছুটা ভেতরের দিকে একটা গলি।একদিকে রামকৃষ্ণ আশ্রম, অন্যদিকে বড় মসজিদ! ঠিক তার মাঝখানে ৪-তলা বিশিষ্ট একটি পুরাতন বাড়ি! অন্য দশটা বাসার মত ঝকঝকে, ফকফকে নয় বাসাটি! বয়সের ভারে অনেকটা জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে উঠেছে! দেয়ালের পলেস্তারা খসে খসে পড়ছে।না জানি কত-শত স্মৃতি জমা হয়ে আছে এ দেয়ালের প্রতিটি পরদে পরদে! কত স্মৃতি,কত কথা,কত হাসি,কত কান্না! যাই হউক,আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো একদম উপরতলায়! দুইটা রুম,একটা ডাইনিং,একটা কিচেন,একটা বাথরুম! পাশেই ছোট্ট করে একটি বেলকুনি! বেলকুনির মধ্যে দাঁড়িয়ে লোকাল মানুষদের ঝগড়া-ঝাটির আওয়াজ গভীরভাবে শোনা যায়!

আমাদের মাথার ঠিক উপরে সিঁড়ি বেয়ে গেলে চোখে পড়ে একটি উন্মুক্ত ছাদ! ছাদটি খুব বেশি বড় নয় ; বেশ স্যাঁতসেঁতে ও বটে! পুরাতন বাসার ছাদ যে পুরাতন হবে ; এটাই স্বাভাবিক! ছাদের চারপাশে বেশ কিছু টব! সেই টবে লাগানো বেশ কিছু গোলাপ আর হাসনা-হেনা গাছ! পাশেই মাটির টব! মাটির টবে বেশ কিছু ঘাসফুল ও জন্মেছে! কিছু গোলাপী রঙের ; কিছু সাদা রঙের! সাদা রঙের ঘাসফুলগুলির সৌন্দর্য্য যেন গোলাপী রঙকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে! যদিও এ ফুলের সু-গন্ধ পাওয়া দুষ্কর।

সাইফুরস'-য়ে ভর্তি হয়ে গেলাম সেদিন! বাসা থেকে খুব বেশি দূরে নয়! হেঁটে গেলে দশ মিনিটের রাস্তা! দ্রুতগতিতে হেঁটে গেলে আট মিনিটেও যাওয়া সম্ভব! প্রতিদিনকার মত কোচিং চলে! কোচিংয়ে বড় ভাইয়েরা ক্লাস নেন! কোচিং করার সুবাদে বেশ কিছু বন্ধু-বান্ধব ও জুটেছে এই সময়ে! প্রতিদিনকার মতো একই রাস্তায় হেঁটে চলি! হাঁটার সময় শুধু একটি স্বপ্নই দেখে যাই- পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা সিট! আর কিছু না।

সেদিন কোচিং সেরে বাসায় এসে শুয়েছি মাত্র! শরীরটা ভালো না! গতদিন ইন্টারমিডিয়েটের রেজাল্ট দিয়েছে! রেজাল্ট ভালো হয় নি ! কিছুটা মন খারাপ! কি আর করা যাবে! ভাবলাম ছাদে গিয়ে ফ্রেশ নিঃশ্বাস নিয়ে আসি! মন কিছুটা হলেও হালকা হবে! যেই ভাবা,সেই কাজ! বলে রাখা ভালো, সে বাসায় উঠার পনের দিনের মধ্যে সে দিনই ছিলো প্রথম ছাদে যাওয়া! কারণবশতঃ ছাদে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ হয় নি অন্য কোনো দিন।

আগেই বলেছি ছাদের টবে বেশ কিছু ফুলগাছ লাগানো ছিলো! আমি খুব গভীরভাবে ফুলগাছগুলি অবলোকন করছিলাম! শুনেছি ফুলের দিকে তাকালে মন হালকা হয় ; ফুলের মত নিষ্পাপ হয়! ঠিক সেই মুহূর্তে আমার চোখের লেন্সে আটকে যায় অচেনা এক মানবীর প্রতিচ্ছবি।ঠিক আমার বাসার পাশের বাসা! আমার ছাদের পাশের ছাদ! একদম আড়াআড়িভাবে লাগানো! কে এই মানবী, এখানে সে করে-ই বা কী? হরেক রকমের প্রশ্ন আমার অনুসন্ধিৎসু মনে দোল খেতে থাকলো।

আমি মেয়েটিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম! বয়স আর কত-ই বা হবে? বিশ-একুশ? আমার চেয়ে সর্বোচ্চ এক কিংবা দেড় বছরের বড় হবে হয়তো! এর বেশি না! আমি খেয়াল করে দেখলাম,মেয়েটিও বেশ অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে! কিছু বলছে না! মেয়েটি কি আমায় আদৌ কিছু বলতে চাচ্ছে? না দেখার ভান করে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে ভাবতে লাগলাম।

ধীরে ধীরে ভর্তি পরীক্ষার সময় ও এগিয়ে আসছে! কোচিংয়ের চাপ ও দ্বিগুণ হারে বেড়ে গেছে! অলরেডি বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ভর্তি সার্কুলার প্রকাশ করেছে! অ্যাপ্লাইয়ের ডেট ও ফিক্সড করে দিয়েছে! সেদিন ও প্রতিদিনের মতো স্টাডি শেষ করে রাতের খাবার খেয়ে মুক্ত বাতাসের খোঁজে ছাদে এলাম! সেদিন ছিলো ব্লাডমুন! আকাশে এত বড় চাঁদ এর আগে আমি উঠতে দেখি নি! চাঁদ দেখছিলাম ; এমন সময় দেখলাম পাশের বাসার সেই মেয়েটি আনন্দ-ভরা চোখে চাঁদের সৌন্দর্য্য অবলোকন করছিলো! আজ আর তাকে সেই দিনের মত মন-মরা দেখাচ্ছিলো না! তবে কি সেই দিন আমার হৃদয়ে যে বিষাদের সুর বেজেছিলো,তার সুরের ধারা তাকেও স্পর্শ করেছিলো? এসব ভাবতে ভাবতে-ই চাঁদ'টা মেঘের আড়ালে লুকিয়ে গেলো।

এর পর প্রায়-ই আমাদের দেখা হতো! কোনো সিডিউল ছিলো না আমাদের! যখন-ই আমি ছাদে উঠতাম,দেখতাম সে বসে বসে আনমনে কি যেন ভাবছে! আমার চোখে তার চোখ পড়া মাত্রই সে নিজেকে গুটিয়ে নিতে দ্বিধা করতো না! আমার এতটুকু বুঝতে বাকি ছিলো না - সে ও হয়তো আমাকে কিছু বলতে চায়! তার মনের গহীনে যে বিষাদের সুর বেজেছে,তার কিছুটা হলেও আমায় অংশীদার করতে চায়! সে আমায় ভালোবাসে না ; এটা সত্য! তবে কেউ যে তার নরম মনের গহীনে ঢুকে আজীবনের জন্য বের হয়ে চলে গেছে ; তা আমি তার দু-চোখের ছলছল করা অশ্রুনয়ন চাহনি দেখে ঠিক-ই আন্দাজ করে নিতে পারি।

সেদিন কোচিং থেকে ফিরে গোসল শেষ করে ছাদে গামছা শুকাতে গেছি। ও মা! দেখি সেই মেয়ে। নাহ্! আজ আমাকে কিছু বলতেই হবে।সে কে, কি জন্যই বা এমন নিশ্চুপ-নির্বাক মনে ছাদে বসে থাকে ; তা আমার জানতেই হবে।আমি সমস্বরে বলতে শুরু করলাম -

"এই যে, আপনার নামটা কি জানতে পারি? কোনো রিপ্লাই পেলাম না। কি ব্যাপার, বোবা নাকি মেয়েটা। কথা বলতে জানে না নাকি।এই যে ম্যাডাম,আপনি কি আমায় শুনতে পাচ্ছেন? এবারো কোনো রিপ্লাই নেই।

কিছুক্ষণ পর আবার বলতে শুরু করলাম -

আচ্ছা,আপনি এই বাসায় কতদিন ধরে আছেন, বলবেন? আপনার বাসায় আর কে কে আছে? নাহ্! এবারো আর কোনো রিপ্লাই পেলাম না! এবার কথার মোড় ঘুরিয়ে বললাম -

আচ্ছা,আপনি কি ফুল ভালোবাসেন?

এতক্ষণ ধরে মেয়েটি অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে ছিলো! এবার আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললো - 'হুম'!

যাক বাবা,মেয়েটি বোবা নয়। আমি টবের গোলাপ গাছ থেকে একটি গোলাপ তার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললাম - আমার এখন স্টাডি আছে! মা ডাকছে! আপনার সাথে পরে কথা হবে! আমার নাম রায়হান! এ বাসায় নতুন! আপনি কিন্তু রাতে ছাদে আসবেন! আপনার সাথে কথা আছে! কেমন? ওকে,বাই! মেয়েটি আমার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে ছিলো! হয়তো তার মনেও কিছু কথা জমা আছে,কারো জন্য!

.

গত দুইদিন ধরে মেয়েটিকে ছাদে পাচ্ছি না! এদিকে আমার কোচিং এর কোর্স ও প্রায় শেষের দিকে। বাবা তাগাদা দিচ্ছেন বাসা ছেড়ে দেয়ার জন্য। প্রয়োজন ছাড়া শুধু শুধু বাসা ভাড়া কে দিতে চাইবে! কিন্তু এদিকে আমি আরো অস্থির হয়ে পড়েছি! মেয়েটা গেলো কই? আজো মেয়েটির কোনো দেখা নেই! তবে কি অসুখ-বিসুখ ভর করলো মেয়েটির উপর? নাহ্! কাল মেয়েটির খোঁজ নিতেই হবে! অন্ততপক্ষে ফোন নম্বরটা হলেও ম্যানেজ করতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতেই চোখের কোণে ঘুম চলে এলো মনের অজান্তে!

.

পরদিন ৪-ঠা সেপ্টেম্বর; ২০১৪। নতুন ভাড়াটিয়া মালামাল নিয়ে উঠে পড়েছে! তাদের কথাবার্তার শব্দ শুনে আমার ঘুম ভাঙ্গলো! ওহ্ আচ্ছা,আমার তো মনেই নেই আজ বাসা ছাড়ার দিন! গতকালই তো মালিক বলে গিয়েছিলো বাসা ছাড়তে! ওহ্ শিট! এই মেমোরি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবো কিভাবে! দিন দিন কি হয়ে যাচ্ছি না! ওহ্ আচ্ছা,ভালো কথা! সেই মেয়েটি আজ কোথায়? এ প্রশ্ন মনে জাগতেই এক দৌড়ে ছাদে গেলাম! ইশ্! শেষবারের মত যদি মেয়েটির দেখা পেতাম! তন্ন তন্ন করে ওর বাসার ছাদ দেখতে লাগলাম! নাহ্! আজো আসে নি মেয়েটি! তবে কি মেয়েটি আমায় ভূলে গেলো? তার মনের ভিতরে থাকা অব্যক্ত কথাগুলি কি আমার জানা হবে না? আমার মনের গহীনে থাকা যে অব্যক্ত প্রেম, তা কি আর ব্যক্ত হবে না? ভাবতে ভাবতেই চোখের কোণে মেঘ জমে এক পশলা বৃষ্টি নেমে এলো!

.

এর পর শুরু হলো ভার্সিটি অ্যাডমিশন টেস্ট! দেশের বেশ কয়টি বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে জায়গা হলো নিজ এলাকার পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়ে! নাহ্! মনস্থির করলাম এবার আবার যাওয়া যাক নওমহলে! যেখানে আমি আমার অব্যক্ত কথাগুলিকে চাপা দিয়ে এসেছিলাম কিছুদিনের জন্যে! এখন ব্যস্ততা নেই ; প্রচুর ফুরসৎ! আচ্ছা,আমি যে এতদিন পরে যাচ্ছি,মেয়েটি কি আমায় চিনবে? আমার কথা মনে রেখেছে সে? নাকি এক পশলা বৃষ্টি ধরে রেখেছে তার চোখের কোণায় ; আমায় দেখলেই তা বিসর্জন দিবে! এসব ভাবতে ভাবতেই যে কখন গাড়ী 'বদরের মোড়' এসে পৌঁছেছে ; তা আমার খেয়ালে নেই!

.

আমি দৌড়ে গেলাম আমার বাসার দিকে! আঙ্কেল-আন্টিকে আমার ভর্তির খবর শুনালাম! তারা খুব খুশি হলেন! আমি সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে ছাদে উঠলাম! পাশের বাসার ছাদে দৃঢ় চোখ রাখলাম! নাহ্! মেয়েটি'কে খুঁজে পেলাম না! আমি আর দেরি করলাম না! আমার বাসা থেকে নেমে সরাসরি তার বাসার গেইটে গিয়ে দাঁড়ালাম! গেইটে বসে থাকা দাঁড়োয়ান আঙ্কেলকে জিজ্ঞেস করলাম -

"এই বাসায় একটা মেয়ে থাকতো না? আমার চেয়ে এক /দেড় বছরের বড় হবে হয়তো! মেয়েটির খোঁজ জানেন?"

দাঁড়োয়ান আঙ্কেল বললো - " ওহ্ আচ্ছা,তমা আফার কথা কইতাছুইন? হেরা তো এই বাসা ছাইড়্যা দিছে! টাঙ্গাইল চইল্যা গেছে!

" কি বলেন আপনি? ফোন নম্বর আছে কি? " - দুশ্চিন্তার স্বরে বললাম!

দাঁড়োয়ান আঙ্কেল বললো- "হ,তার বাপের একটা নম্বর আছে! ট্রাই কইরা দেখতে পারেন! এই যে নম্বর ০১৭********"

.

আমি দেরি না করে দাঁড়োয়ান আঙ্কেলের দেয়া নম্বর ডায়াল করলাম! ডায়াল করতেই ভেসে আসলো সেই চিরচেনা কন্ঠ -

"আপনার ডায়ালকৃত সিমটি বন্ধ রয়েছে!অনুগ্রহপূর্বক,কিছুক্ষণ পর আবার ডায়াল করুন!"

আমি ভয়ার্ত চোখে আরো কয়েকবার ডায়াল করলাম! ফোনের স্পিকারে বেজে উঠলো সেই চির-চেনা সুর-

" আপনার ডায়ালকৃত সিমটি বন্ধ রয়েছে! অনুগ্রহপূর্বক, কিছুক্ষণ পর আবার ডায়াল করুন!"

.

এর পর সে মেয়েটির সাথে আমার কোনোদিনও দেখা হয় নি ; কথা-ও হয় নি! কেমন আছে সে? কোথায় আছে ? সে কি এখনো রাত হলে ছাদে উঠে? আমায় খুঁজে? আমার মনে যখন বিষাদের সুর বাজে,সে সুরের ধারা কি তার কর্ণে বাজে? ভাবতে পারি না আমি,বুঝতে চাই না আমি! রাত ৪ টা বেজে ৪ মিনিট! আর চিন্তা করতে পারবো না! ঘুমাবো আমি! এ ঘুম-ই শেষ ঘুম নয় তো?

Sign in to comment
এই বিভাগের আরো পোস্ট